১. পরিচয়
হেমন্তের বিকেল। গাছের পাতায় পড়ে থাকা সোনালি আলোয় ঝলমল করছে ঢাকা শহর। বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের ছাত্রী অদিতি ক্লাস শেষে লাইব্রেরিতে বসে পড়ছিল। হঠাৎ করেই পাশ থেকে এক মৃদু কণ্ঠ ভেসে এল—
“এই বইটা তুমি শেষ করেছ?”
অদিতি চমকে তাকিয়ে দেখে একজন অচেনা ছেলে। তার হাতে একটি পুরোনো কবিতার বই। ছেলেটির চোখে-মুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি।
“হ্যাঁ, কিন্তু আমার খুব প্রিয় বই এটি। তুমি নিতে চাইলে আবার ফেরত দিও,” মুচকি হেসে বলল অদিতি।
ছেলেটি হেসে জানাল, তার নাম আবির। সেইদিন থেকেই পরিচয় শুরু। অদিতি আর আবির প্রতিদিনই একসাথে সময় কাটাতে শুরু করল।
আবির খুব সংবেদনশীল আর আবেগপ্রবণ একজন মানুষ। সে সহজেই মানুষের অনুভূতি বুঝতে পারত, আর অদিতির মনের সবকথা শোনার ধৈর্যও তার ছিল। ধীরে ধীরে তাদের বন্ধুত্ব গভীর হয়ে গেল।
২. ভালবাসার জন্ম
শীতের এক বিকেলে, হাতের গরম কফি নিয়ে তারা দু’জন বসেছিল ক্যাম্পাসের লেকে। হঠাৎ করেই আবির জিজ্ঞেস করল—
“অদিতি, কখনো কি এমন হয়েছে, তুমি কাউকে ভালোবেসেছ, কিন্তু বলতে পারোনি?”
অদিতি একটু চুপ করে থেকে বলল—
“হয়তো ভালোবেসেছিলাম... কিন্তু সাহস করে বলতে পারিনি। ভয় ছিল, যদি সে না বোঝে?”
আবির মৃদু হেসে বলল—
“মনে রেখো, মনের কথা না বললে সেটা চিরকাল মনের মাঝেই থেকে যায়। কখনো কেউ জানতে পারে না।”
অদিতি কিছু বলল না। কিন্তু তার হৃদয়ের ভেতর আবিরের জন্য এক অজানা অনুভূতি জেগে উঠল। সে বুঝতে পারছিল, সে হয়তো আবিরকে ভালোবেসে ফেলেছে। কিন্তু সে কিছুতেই তার মনের কথা বলতে পারছিল না, কারণ সে জানত না আবিরের অনুভূতি কী।
৩. কঠিন সত্য
একদিন, আবির হঠাৎ করে অদিতির কাছে দেখা করতে এল। তার মুখে ছিল এক অদ্ভুত বিষণ্নতা।
“অদিতি, আমার তোমার সাথে খুব জরুরি কিছু কথা আছে,” আবির বলল।
অদিতি কিছুটা চিন্তিত হয়ে তার দিকে তাকাল।
“আমার জীবনে খুব কম সময় বাকি আছে, অদিতি। আমার হার্টের একটি বিরল সমস্যা আছে। চিকিৎসকেরা বলেছে, আমার হয়তো আর বেশিদিন বাঁচার সম্ভাবনা নেই,” আবিরের কণ্ঠে ছিল এক চাপা বিষণ্নতা।
অদিতির মনে যেন বজ্রপাত হলো। সে বিশ্বাস করতে পারছিল না, এতদিন যাকে ভালোবেসে এসেছে, তার জীবনে এত বড় দুঃসংবাদ লুকিয়ে ছিল!
কিছুক্ষণ চুপ থেকে, কাঁপা গলায় অদিতি বলল—
“কিন্তু তুমি আমাকে কিছু বললে না কেন? কেন এতদিন ধরে একা সহ্য করছ?”
আবির হাসল—
“আমি তোমার জীবনে কষ্ট আনতে চাইনি, অদিতি। আমি জানি, তুমি আমাকে ভালোবাসো, আর আমিও তোমাকে ভালোবাসি। কিন্তু আমি জানি, আমার সাথে জড়িয়ে তুমি আরও বেশি কষ্ট পাবে।”
৪. অসমাপ্ত অধ্যায়
এরপর থেকে অদিতি প্রতিদিন আবিরের সাথে সময় কাটাতে শুরু করল। তারা দু’জনেই জানত, সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। কিন্তু তাদের ভালোবাসা যেন আরও গভীর হয়ে উঠল।
এক সন্ধ্যায়, যখন সূর্যটা ধীরে ধীরে অস্ত যাচ্ছিল, আবির অদিতির হাত ধরে বলল—
“তুমি জানো, অদিতি, আমি হয়তো বেশিদিন বাঁচব না, কিন্তু তোমার ভালোবাসা আমার হৃদয়ে চিরকাল থাকবে।”
অদিতি কাঁদতে কাঁদতে বলল—
“আমি তোমাকে ছাড়তে পারব না, আবির। তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচতে পারব না।”
আবির তার চোখের জল মুছে বলল—
“তুমি বাঁচবে, অদিতি। তুমি অনেক শক্তিশালী। আমার জন্য তোমাকে কাঁদতে হবে না। আমি চাই, তুমি হাসি মুখে বাঁচো, আমার স্মৃতি নিয়ে।”
৫. শেষ প্রস্থান
কিছুদিন পর, আবির তার জীবনের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করল। অদিতির জন্য সে রেখে গেল একটি চিঠি।
চিঠিতে লেখা ছিল—
**“প্রিয় অদিতি,
আমি জানি, আমার চলে যাওয়ার পর তোমার জীবন অনেক কঠিন হয়ে যাবে। কিন্তু বিশ্বাস করো, আমি চিরকাল তোমার সাথে আছি। তুমি নতুন করে বাঁচতে চেষ্টা করো, নতুন করে স্বপ্ন দেখো। আমার স্মৃতিগুলো তোমার জন্য নয়, বরং তোমার হাসিটাই আমার জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকুক। ভালো থেকো, প্রিয়তমা।
তোমার,
আবির”**
চিঠিটা পড়ে অদিতি ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। তার হৃদয় ভেঙে চুরমার হয়ে গেলেও, সে আবিরের ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে ধীরে ধীরে নিজের জীবনকে নতুনভাবে সাজাতে শুরু করল।
কিন্তু প্রতিটি বর্ষার দিনে, যখন আকাশ ভিজে যায়, অদিতি জানালার পাশে বসে আবিরের কথা মনে করে। তার হৃদয়ে একটুকরো ভালোবাসা রয়ে গেছে, যা কখনোই মুছে যাবে না।

0 Comments