অপেক্ষার শেষ প্রহর”
শীতের বিকেল। মৃদু ঠান্ডা বাতাসে চারপাশ কাঁপছে। ঢাকার ব্যস্ত রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে তৃষা হঠাৎ থেমে গেল। তার চোখ পড়ল রাস্তার ধারের একটি পুরোনো চায়ের দোকানে। দোকানটি দেখে তার মনে পুরনো দিনের স্মৃতিরা আবার জেগে উঠল। এখানে দাঁড়িয়েই তো একদিন আরিফের সাথে কত গল্প হতো, কত হাসি, কত সুখ-দুঃখের ভাগাভাগি।
দুই বছর আগের সেই দিনগুলো কতই না সুন্দর ছিল। আরিফ ছিল তৃষার কলেজ জীবনের একমাত্র ভালো বন্ধু। ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব প্রেমে পরিণত হয়, কিন্তু কারোর মুখেই সে কথা প্রকাশ পায়নি। তৃষা মনে মনে বুঝত, আরিফও তাকে ভালোবাসে। কিন্তু একদিন হঠাৎ করেই আরিফকে ফোন করে আর খুঁজে পাওয়া যায় না। তৃষা বারবার চেষ্টা করেও আরিফের সাথে যোগাযোগ করতে পারেনি। সময়ের সাথে ধীরে ধীরে সে আশা ছেড়ে দেয়।
আজ সেই পুরোনো স্মৃতির জায়গায় দাঁড়িয়ে তৃষা বুঝতে পারল, তার মনের গভীরে এখনও আরিফের জন্য অপেক্ষা রয়ে গেছে। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে সে ভাবছিল, যদি কোনোভাবে আরিফকে আবার দেখতে পেত!
ঠিক তখনই, একটি পরিচিত কণ্ঠস্বর শুনতে পেল সে—
“তৃষা, তুমি?”
তৃষা ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল, আরিফ দাঁড়িয়ে আছে। সময় যেন থেমে গেল। চোখে চোখ পড়তেই তাদের মধ্যে যেন এক অদৃশ্য বাঁধন তৈরি হয়ে গেল। আরিফ এগিয়ে এসে বলল—
“তোমার জন্য অনেক অপেক্ষা করেছি। আমি জানি, হঠাৎ করেই হারিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু বিশ্বাস করো, আমার ইচ্ছা ছিল না।”
তৃষা কিছু বলতে পারছিল না, কেবল অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল তার দিকে। আরিফ ধীরে ধীরে বলল—
“আমার পরিবার হঠাৎ দেশের বাইরে চলে গেল। আর আমি কোনোভাবেই তোমার সাথে যোগাযোগ করতে পারিনি। কিন্তু আমি প্রতিদিন তোমার কথা ভেবেছি।”
তৃষার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
“তুমি জানো, আমি আজও তোমার অপেক্ষায় ছিলাম,” তৃষা বলল কাঁপা গলায়।
আরিফ হাত বাড়িয়ে তৃষার হাত ধরল। চারপাশের কোলাহল তখন যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। শীতের বিকেলে সূর্যটা ধীরে ধীরে অস্ত যাচ্ছিল।
“তৃষা, এবার আর আমি তোমার হাত ছেড়ে যাব না। আমি সব হারিয়ে আবার ফিরে এসেছি, শুধুই তোমার জন্য,” আরিফ বলল।
তৃষা কিছু না বলে তার হাতে হাত রেখে হালকা হেসে বলল,
“এই হাতটা আর ছাড়তে দিও না।”
দুজনেই একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসল। চারপাশের কোলাহল, মানুষের ভিড়, সবকিছুই যেন মিলিয়ে গেল তাদের সেই মুহূর্তে। শুধু রয়ে গেল দু’জন মানুষের ভালোবাসা আর অপেক্ষার পর ফিরে পাওয়া সুখের একান্ত কিছু মুহূর্ত।

0 Comments