গোপন প্রেয়সী

রাত তখন গভীর। শহরের ব্যস্ততা থেমে গেছে, চারপাশ নীরব। রাস্তার পাশে বসে রুদ্র নিজের ভাবনাগুলো জট পাকাচ্ছিল। পকেট থেকে সিগারেট বের করল সে, তারপর সজোরে একটি নিশ্বাস ফেলে জ্বালিয়ে নিল। কিন্তু আজ সিগারেটও তাকে শান্তি দিতে পারছিল না।

রুদ্র একজন সফল চিত্রগ্রাহক। তার জীবন ছবির মতোই রঙিন, তবে এই রঙিন জীবনে এক অদৃশ্য কালো ছায়া ঘুরে বেড়ায়। সেই ছায়ার নাম নীলা। নীলা রুদ্রর গোপন প্রেয়সী।

দু'বছর আগে একটি গানের ভিডিও শুট করতে গিয়ে প্রথম দেখা হয়েছিল তাদের। নীলার চোখে ছিল একধরনের গভীরতা, যা রুদ্রকে আকর্ষণ করেছিল। কাজ শেষে নীলা তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে চলে গিয়েছিল, কিন্তু তার মায়াবী হাসি রুদ্রর হৃদয়ে ছাপ রেখে গিয়েছিল।

তারপর থেকে বিভিন্ন কাজে তাদের বারবার দেখা হয়েছে। নীলা নিজেও একজন প্রতিভাবান শিল্পী। মাঝে মাঝে গল্প করতে করতে রাত কাটিয়ে দিত তারা। কিন্তু তাদের সম্পর্কটা অদ্ভুত। দু'জনই জানে একে অপরের প্রতি অনুভূতির কথা, তবুও কেউ কখনো প্রকাশ করেনি।

রুদ্রর মনে অনেকবার ইচ্ছা হয়েছে নীলাকে সব খুলে বলার। কিন্তু তাকে থামিয়ে দিয়েছে বাস্তবতা। নীলা একজন প্রতিষ্ঠিত গায়িকা, তার নিজের আলাদা জীবন আছে। আর রুদ্র? সে জানে তার জীবন এতটা অগোছালো যে সেখানে নীলাকে জড়ানো মানেই তার ওপর অন্যায়।

নীলাও বুঝতে পারে রুদ্রর দ্বিধা। তার হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকে এক গভীর বেদনা। তারা যেন দুই ভিন্ন পথের পথিক, যারা একই আকাশের নিচে চললেও একে অপরকে ছুঁতে পারে না।

একদিন, শীতের এক সন্ধ্যায়, রুদ্র তার অফিসে কাজ করছিল। হঠাৎ নীলার মেসেজ এলো, "আজ রাতের আকাশ দেখেছ? অনেক দিন পর পুরো চাঁদ উঠেছে।"

রুদ্র জানত এই ইঙ্গিতের অর্থ। সে ছাদে উঠে নীলার মেসেজের উত্তর দিল, "তুমি কি জানো, চাঁদ দেখে তোমার কথাই মনে পড়ে?"

পাশ থেকে একটি পরিচিত কণ্ঠ শোনা গেল, "আর আমার চাঁদ কাকে দেখে মনে পড়ে?"

রুদ্র ঘুরে তাকিয়ে দেখে, নীলা সেখানে দাঁড়িয়ে। তার চোখে জল, ঠোঁটে মৃদু হাসি।

সেই রাতে, তারা প্রথমবারের মতো নিজেদের অনুভূতির কথা প্রকাশ করল। কিন্তু সেই স্বীকারোক্তি কোনো প্রতিশ্রুতি নিয়ে আসেনি। তারা দু'জনই জানত, তাদের সম্পর্ক চাঁদের মতো—সৌন্দর্যে পূর্ণ, কিন্তু দূরত্বের শৃঙ্খলে বাঁধা।

নীলা ফিরে গেল, রুদ্রও তার নিজের জীবনে ডুবে গেল। তবে তাদের হৃদয়ের এক কোণে সবসময়ই থাকবে সেই গোপন জায়গা, যেখানে তাদের সম্পর্ক বেঁচে থাকবে, যতদিন না চাঁদ আকাশে থাকে।

Post a Comment

0 Comments